কেন আমরা স্বপ্ন দেখি? বিজ্ঞান কী বলে

   

Sleeping person-er brain theke dream scenes bereche: কেন আমরা স্বপ্ন দেখি, REM sleep ও brain science-এর ব্যাখ্যা

প্রতি রাতে আপনি ঘুমিয়ে পড়েন, আর কিছুক্ষণ পরেই আপনার মস্তিষ্ক একটা পুরো সিনেমা চালু করে দেয়। কখনও আপনি আকাশে উড়ছেন, কখনও পরীক্ষার হলে বসে আছেন অথচ কিছুই পড়া হয়নি, কখনও বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া কাউকে আবার দেখছেন। ঘুম ভাঙলে কিছুটা মনে থাকে, বেশিরভাগই মিলিয়ে যায়।

গবেষকদের হিসাবে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ রাতে গড়ে প্রায় দুই ঘণ্টা স্বপ্ন দেখেন। সারা জীবনের হিসাবে সেটা কয়েক বছর। অথচ এত পরিচিত একটা অভিজ্ঞতার পেছনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটার সর্বজনস্বীকৃত উত্তর বিজ্ঞান এখনও দিতে পারেনি: কেন আমরা স্বপ্ন দেখি?

এই লেখায় আমরা দেখব:

  • ঘুমের কোন পর্যায়ে স্বপ্ন আসে এবং তখন মস্তিষ্কে কী ঘটে
  • স্বপ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীদের পাঁচটি প্রধান তত্ত্ব, এবং কোনটির পক্ষে কতটা প্রমাণ আছে
  • দুঃস্বপ্ন, স্বপ্ন ভুলে যাওয়া ও lucid dreaming (সচেতন স্বপ্ন)
  • স্বপ্নের "অর্থ" নিয়ে প্রচলিত ধারণার কতটা বিজ্ঞানসম্মত

শুরুতেই একটা কথা পরিষ্কার করে রাখি: স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে। তাই যেখানে প্রমাণ শক্ত, সেখানে স্পষ্ট বলব; যেখানে এটা কেবল অনুমান বা প্রাথমিক গবেষণা, সেখানেও সেটা পরিষ্কার লিখব।


স্বপ্ন আসলে কী?

বিজ্ঞানের ভাষায় স্বপ্ন হলো ঘুমের সময় মনের ভেতরে তৈরি হওয়া ছবি, শব্দ, অনুভূতি ও গল্পের ধারা, যা আমরা তখন বাস্তব বলেই অনুভব করি। স্বপ্নে সাধারণত আমরা নিজের ইচ্ছামতো কিছু ঠিক করতে পারি না, ঘটনাগুলো "ঘটে যায়"। আর আশ্চর্যের বিষয়, স্বপ্নের মধ্যে অদ্ভুত কিছু ঘটলেও আমাদের বেশিরভাগ সময় সেটা অদ্ভুত মনে হয় না। কারণ মস্তিষ্কের যে অংশ যুক্তি ও বিচার করে (সামনের দিকের prefrontal cortex), ঘুমের সময় তার কার্যকলাপ তুলনামূলক কমে যায় বলে মনে করা হয়।


ঘুমের ধাপ: স্বপ্ন কোথায় আসে?

ঘুম একটানা একরকম অবস্থা নয়। রাতে আমরা কয়েকটি চক্রের ভেতর দিয়ে যাই, প্রতিটি চক্র মোটামুটি ৯০ মিনিটের।

১. NREM (Non-REM) ঘুম
এখানে তিনটি ধাপ আছে, হালকা ঘুম থেকে গভীর ঘুম পর্যন্ত। শরীর শিথিল হয়, হৃৎস্পন্দন ও শ্বাস ধীর হয়। এই সময়েও স্বপ্ন দেখা যায়, তবে সেগুলো সাধারণত ছোট, কম ছবিময় ও চিন্তার মতো।

২. REM (Rapid Eye Movement) ঘুম
এই পর্যায়ে চোখ বন্ধ অবস্থাতেও দ্রুত নড়তে থাকে, মস্তিষ্কের কার্যকলাপ জেগে থাকার কাছাকাছি পৌঁছায়, আর শরীরের বেশিরভাগ পেশি সাময়িকভাবে অসাড় হয়ে যায় (যাকে বলে REM atonia), যাতে আমরা স্বপ্নের কাজ বিছানায় করে না ফেলি। সবচেয়ে স্পষ্ট, রঙিন ও আবেগঘন স্বপ্ন সাধারণত এই সময়েই দেখা যায়।

রাত যত গড়ায়, REM পর্যায় তত দীর্ঘ হয়। তাই ভোরের দিকের স্বপ্নগুলো সাধারণত সবচেয়ে লম্বা ও স্মরণীয়।

একটা জনপ্রিয় ভুল ধারণা হলো "স্বপ্ন শুধু REM ঘুমেই আসে।" এটা ঠিক নয়। ঘুম-গবেষণায় দেখা গেছে, REM ঘুম থেকে জাগালে মানুষ স্বপ্নের বিবরণ দেয় অনেক বেশি ক্ষেত্রে, তবে NREM ঘুম থেকে জাগালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ কিছু না কিছু স্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতার কথা বলেন।


স্বপ্ন নিয়ে ৫টি প্রধান বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব

এখানেই আসল রহস্য। কোনো একটি তত্ত্ব সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারেনি। প্রতিটি তত্ত্ব স্বপ্নের একেকটি দিক ব্যাখ্যা করে। চলুন একে একে দেখি।

তত্ত্ব ১: Activation-Synthesis (সক্রিয়করণ-সংশ্লেষণ)

১৯৭৭ সালে হার্ভার্ডের গবেষক অ্যালান হবসন ও রবার্ট ম্যাককার্লি এই তত্ত্ব দেন। মূল ধারণা: REM ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কাণ্ড (brainstem) থেকে এলোমেলো বৈদ্যুতিক সংকেত ছড়িয়ে পড়ে। মস্তিষ্ক সেই সংকেতগুলোকে অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করে এবং নিজের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে একটা গল্প বানিয়ে ফেলে। অর্থাৎ স্বপ্ন অনেকটা মস্তিষ্কের "ব্যাখ্যা করার চেষ্টা", এর গভীর কোনো গোপন বার্তা নেই।

সীমাবদ্ধতা: পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে স্বপ্ন কেবল এলোমেলো নয়, অনেক সময় অর্থবহ ও ব্যক্তিগত বিষয়ের সঙ্গে সংযুক্ত। তাছাড়া NREM স্বপ্নও আছে। তাই এই তত্ত্বকে এখন আংশিকভাবে গ্রহণ করা হয়।

তত্ত্ব ২: Memory Consolidation (স্মৃতি সুসংহতকরণ)

এই তত্ত্ব বলে, ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের অভিজ্ঞতা বাছাই করে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সাজিয়ে রাখে এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ ছেঁটে ফেলে। স্বপ্ন সেই প্রক্রিয়ার একটা "উপজাত" বা ঝলক হতে পারে।

কী প্রমাণ আছে: ঘুম যে স্মৃতি সংরক্ষণে সাহায্য করে, এ বিষয়ে প্রচুর পরীক্ষামূলক প্রমাণ আছে। যেমন নতুন কিছু শেখার পর ভালো ঘুম হলে সেটা মনে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, কোনো কাজ শেখার পর সেই কাজ-সম্পর্কিত স্বপ্ন দেখলে পরে ওই কাজে উন্নতি বেশি হয়।

সীমাবদ্ধতা: স্বপ্ন নিজেই স্মৃতি সংরক্ষণের কারণ, নাকি দুটো একসঙ্গে ঘটে মাত্র, এটা এখনও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।

তত্ত্ব ৩: Emotional Processing (আবেগ প্রক্রিয়াকরণ)

এই ধারণা অনুযায়ী স্বপ্ন আমাদের আবেগ সামলাতে সাহায্য করে। REM ঘুমে মস্তিষ্কের আবেগ-সম্পর্কিত অংশ (amygdala ও তার আশপাশ) খুব সক্রিয় থাকে, অথচ স্ট্রেস-সংশ্লিষ্ট কিছু রাসায়নিক পদার্থের মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে বলে ধরা হয়। ফলে কষ্টদায়ক স্মৃতিকে একটি "নিরাপদ পরিবেশে" পুনরায় ঘেঁটে দেখা সম্ভব হয়, আর পরদিন সেই স্মৃতির তীব্রতা কিছুটা কমে।

এই কারণেই অনেক গবেষক মনে করেন, খুব মানসিক চাপের সময় আমাদের স্বপ্ন বেশি ঘন ও আবেগঘন হয়।

সীমাবদ্ধতা: প্রমাণ আছে, কিন্তু এটা এখনও "সম্ভাব্য ভূমিকা" পর্যায়ে। সব স্বপ্ন আবেগ কমায় না। কিছু স্বপ্ন (বিশেষ করে বারবার ফিরে আসা দুঃস্বপ্ন) উল্টো আবেগকে আরও চাঙ্গা করে।

তত্ত্ব ৪: Threat Simulation (বিপদ-মহড়া)

ফিনল্যান্ডের গবেষক অ্যান্টি রেভোনসুও এই তত্ত্ব দেন। তাঁর মতে, মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে বিপদ ছিল নিত্যসঙ্গী। স্বপ্ন হতে পারে একটি নিরাপদ "প্রশিক্ষণ-মঞ্চ", যেখানে মস্তিষ্ক বিপদের মোকাবিলা বারবার অনুশীলন করে।

এই কারণে ব্যাখ্যা করা হয়, কেন এত মানুষ স্বপ্নে তাড়া খায়, পড়ে যায় বা আক্রান্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বপ্নে নেতিবাচক আবেগ (ভয়, উদ্বেগ) ইতিবাচক আবেগের চেয়ে সাধারণত বেশি পাওয়া যায়।

সীমাবদ্ধতা: এই তত্ত্ব বিতর্কিত। অনেক স্বপ্ন মোটেই বিপদ-সংক্রান্ত নয়, আর স্বপ্নে আমরা প্রায়ই বিপদ মোকাবিলায় সফল হই না। তাই সমালোচকরা বলেন, কার্যকর মহড়া হিসেবে স্বপ্ন খুব ভালো নয়।

তত্ত্ব ৫: Defensive Activation এবং "ওয়ার্ল্ড মডেল" ধারণা

এটা তুলনামূলক নতুন ধারণার দিকে ইঙ্গিত করে। একটি ধারণা (Defensive Activation Theory) বলে, REM ঘুমের সময় মস্তিষ্কের দৃষ্টি-সংক্রান্ত অংশকে সক্রিয় রাখা হয়, যাতে ঘুমের সময় আমাদের বাস্তব জগতের সংবেদনশীল অঞ্চল দখল না হয়ে যায় (মস্তিষ্ক "ব্যবহার না করলে হারায়" নীতিতে কাজ করে)। স্বপ্নের দৃশ্য তখন এই সক্রিয়তার একটা ফল।

আরেকটি ইঙ্গিতপূর্ণ গবেষণা এসেছে Howard Hughes Medical Institute (HHMI)-এর সঙ্গে যুক্ত গবেষক ম্যাসিমো স্ক্যানজিয়ানি ও তাঁর দলের কাছ থেকে। তাঁদের ধারণা, ঘুমের সময় মস্তিষ্ক নিজের ভেতরের "বিশ্বের মডেল" (world model) পরীক্ষা ও হালনাগাদ করে, যাতে জেগে উঠে পরিবেশ আরও ভালোভাবে বুঝতে ও পূর্বাভাস দিতে পারে। এটা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা, তাই একে চূড়ান্ত সত্য বলা যাবে না। তবে এটা দেখায়, স্বপ্ন-গবেষণা এখন শুধু মনস্তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়, স্নায়ুবিজ্ঞানের গভীরে ঢুকছে।


পাঁচ তত্ত্ব এক নজরে

তত্ত্বমূল ধারণাপ্রমাণের অবস্থা
Activation-Synthesisএলোমেলো সংকেতে মস্তিষ্ক গল্প বানায়আংশিক সমর্থিত
Memory Consolidationস্মৃতি গোছানোর সঙ্গে স্বপ্ন যুক্তঘুমের ভূমিকায় শক্ত, স্বপ্নের ভূমিকায় অনিশ্চিত
Emotional Processingআবেগ সামলাতে সাহায্য করেসম্ভাবনাময়, সব ক্ষেত্রে নয়
Threat Simulationবিপদের মহড়াবিতর্কিত
Defensive Activation / World Modelমস্তিষ্কের অঞ্চল সক্রিয় রাখা, বিশ্ব-মডেল হালনাগাদপ্রাথমিক গবেষণা

আমরা কেন বেশিরভাগ স্বপ্ন ভুলে যাই?

সকালে উঠে মনে হয় অসাধারণ একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম, কিন্তু দশ মিনিট পরে প্রায় কিছুই মনে নেই। এর কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ:

  • ঘুমের সময় নতুন স্মৃতি তৈরির জন্য দায়ী কিছু রাসায়নিক পদার্থের (যেমন নরএপিনেফ্রিন) মাত্রা কম থাকে বলে মনে করা হয়।
  • ঘুম থেকে ওঠার সময় স্বপ্নের কাহিনি "দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে" লেখা হওয়ার আগেই জাগরণের তথ্যের চাপে চাপা পড়ে যায়।
  • যে স্বপ্ন ভোরে ঘুম ভাঙার ঠিক আগে দেখা হয়, সেটা মনে থাকার সম্ভাবনা বেশি।

স্বপ্ন মনে রাখার সহজ কিছু উপায়: বিছানার পাশে একটা খাতা রাখুন। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ রেখেই যতটুকু মনে পড়ে, সেটা লিখে ফেলুন। নিয়মিত অভ্যাস করলে অনেকের মনে রাখার ক্ষমতা বাড়ে।


সারাদিনের অভিজ্ঞতা কি স্বপ্নে ঢোকে?

হ্যাঁ, এবং এ বিষয়ে প্রমাণও আছে। দিনের বেলায় আমরা যা দেখি, শুনি, ভাবি, তার অংশ স্বপ্নে ফিরে আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের আগে কোনো ভিডিও গেম খেলা বা সিনেমা দেখার পর মানুষের স্বপ্নে সেই বিষয়ের উপাদান ঢুকে পড়ে। একটি পর্যালোচনা অনুযায়ী, ঘুমের আগের মিডিয়ার উপাদান REM স্বপ্নের মোটামুটি ৩ থেকে ৪৩ শতাংশে এবং NREM স্বপ্নের ৪ থেকে ৩০ শতাংশে দেখা গেছে। এই বিস্তৃত পরিসর বোঝায়, ফলাফল গবেষণার পদ্ধতি ও ব্যক্তির উপর অনেক নির্ভর করে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার, প্রায়ই স্বপ্নে সরাসরি আগের দিনের ঘটনা না এসে কয়েকদিন আগের ঘটনা ফিরে আসে (একে বলে dream-lag effect)।


দুঃস্বপ্ন (Nightmare): কেন ভয় পাই?

দুঃস্বপ্ন এমন স্বপ্ন, যা ঘুম ভাঙিয়ে দেয় এবং তীব্র ভয় বা উদ্বেগ রেখে যায়। বেশিরভাগ মানুষ মাঝেমধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখেন। শৈশবে এটা বেশি সাধারণ।

যেসব বিষয় দুঃস্বপ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পরিচিত:

  • মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
  • অনিয়মিত বা অপর্যাপ্ত ঘুম
  • ঘুমের আগে ভীতিকর কিছু দেখা বা পড়া
  • কিছু ওষুধ বা অ্যালকোহলের প্রভাব
  • আঘাতজনিত মানসিক অভিজ্ঞতার পরে

সতর্কতা: যদি দুঃস্বপ্ন খুব ঘন ঘন হয়, প্রতিদিনের জীবন বা ঘুম ব্যাহত করে, তাহলে একজন চিকিৎসক বা ঘুম-বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো। এটা চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা, এবং এর জন্য সহায়তা পাওয়া যায়।

অন্যান্য ঘুম-সংক্রান্ত রহস্য নিয়ে জানতে পড়তে পারেন আমাদের ঘুমের মধ্যে হাঁটার রহস্য (Sleepwalking) লেখাটি।


Lucid Dreaming: স্বপ্নের মধ্যে জেগে থাকা

Lucid dream হলো এমন স্বপ্ন, যেখানে আপনি বুঝতে পারেন যে আপনি স্বপ্ন দেখছেন, এবং অনেক সময় স্বপ্নের গতিপথ কিছুটা নিয়ন্ত্রণও করতে পারেন। গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটা বাস্তব ঘটনা। কিছু পরীক্ষায় lucid-স্বপ্নদ্রষ্টারা স্বপ্নের মধ্যে থেকেই পূর্বনির্ধারিত চোখের নড়াচড়ার মাধ্যমে বাইরের গবেষকদের সংকেত পাঠিয়েছেন।

কীভাবে চেষ্টা করা হয়: জেগে থাকা অবস্থায় বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করা "আমি কি স্বপ্ন দেখছি?", স্বপ্নের ডায়েরি রাখা, এবং ঘুমের কিছুক্ষণ পর জেগে আবার শুয়ে পড়ার মতো কিছু কৌশল নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এগুলোর কার্যকারিতা মানুষভেদে ভিন্ন।

সতর্কতা: দুঃস্বপ্ন-সংক্রান্ত সমস্যায় lucid dreaming-ভিত্তিক থেরাপির উপর কিছু প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল গবেষণা হয়েছে, এবং কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। তবে এটা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ের প্রমাণ, প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নয়। আর যাঁদের ঘুমের সমস্যা বা মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা আছে, তাঁদের নিজে নিজে ঘুম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।


স্বপ্নের "অর্থ" কি আছে? স্বপ্নের ব্যাখ্যা বই কি সত্যি?

দাঁত পড়ে যাওয়া, সাপ দেখা, উড়তে পারা, পানিতে ডুবে যাওয়া, এসব স্বপ্নের নির্দিষ্ট "অর্থ" নিয়ে বাজারে অনেক বই ও ওয়েবসাইট আছে। এগুলো নিয়ে সৎভাবে যা বলা যায়:

যা বলা যায়:

  • স্বপ্নের বিষয়বস্তু আমাদের জেগে থাকা জীবনের চিন্তা, চিন্তা-দুশ্চিন্তা ও আবেগের সঙ্গে প্রায়ই সম্পর্কিত। এ নিয়ে গবেষণায় সমর্থন আছে।
  • নির্দিষ্ট কিছু স্বপ্ন অনেক মানুষের মধ্যে সাধারণ (যেমন পরীক্ষার স্বপ্ন, তাড়া খাওয়ার স্বপ্ন)।

যা বলা যায় না:

  • কোনো নির্দিষ্ট প্রতীকের (যেমন সাপ মানেই শত্রু, দাঁত পড়া মানেই মৃত্যুসংবাদ) বিশ্বজনীন বা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত অর্থ আছে, এমন কোনো দৃঢ় প্রমাণ নেই।
  • স্বপ্ন ভবিষ্যৎ বলে দেয়, এ ধারণার পক্ষেও কোনো বৈজ্ঞানিক সমর্থন নেই।

ফ্রয়েডের মতো মনোবিজ্ঞানীরা স্বপ্নকে "অবচেতন ইচ্ছার প্রকাশ" হিসেবে দেখেছিলেন। সেই ধারণা মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশাল প্রভাব ফেলেছে, তবে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান সেটাকে আক্ষরিকভাবে সমর্থন করে না। তার মানে এই নয় যে নিজের স্বপ্ন নিয়ে ভাবা অর্থহীন। বরং নিজের স্বপ্নে বারবার কোনো বিষয় ফিরে এলে সেটা আপনার জীবনের কোন দুশ্চিন্তার সঙ্গে যুক্ত, সেটা ভেবে দেখা অনেকের কাছে সহায়ক হয়।


ভালো স্বপ্ন ও ভালো ঘুমের জন্য ৭টি অভ্যাস

স্বপ্ন সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, কিন্তু ঘুমের মান উন্নত করলে স্বাভাবিকভাবে স্বপ্নের ধারাও স্থিতিশীল থাকে।

১. নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও ওঠা, ছুটির দিনেও (যতটা সম্ভব)।
২. ঘুমের এক-দুই ঘণ্টা আগে মোবাইল, টিভির স্ক্রিন কমানো।
৩. ঘুমের আগে ভারী খাবার ও ক্যাফেইন এড়ানো।
৪. ঘর অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক রাখা।
৫. ঘুমের আগে মানসিক চাপের বিষয় নিয়ে ভাবা বা ঝগড়া-বিতর্ক এড়ানো। দুশ্চিন্তা থাকলে খাতায় লিখে রাখা।
৬. অ্যালকোহল পরিহার, কারণ এটা REM ঘুমের ধরন বদলে দিতে পারে।
৭. নিয়মিত শরীরচর্চা, তবে ঘুমের একদম আগে নয়।

রাতে দেরি করে ঘুমানোর ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন: রাত জেগে ঘুমানো কেন ক্ষতিকর। আর যদি ঘুমই না আসে, তাহলে দেখতে পারেন ঘুম না এলে কী করা উচিত।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: সবাই কি স্বপ্ন দেখে?
উত্তর: গবেষণা অনুযায়ী প্রায় সব মানুষই ঘুমের সময় স্বপ্ন দেখেন, যদিও অনেকে সকালে মনে রাখতে পারেন না। কিছু মানুষ বলেন তাঁরা "কখনও স্বপ্ন দেখেন না", কিন্তু ঘুম-গবেষণাগারে জাগালে তাঁদের অনেকেই স্বপ্নের বিবরণ দেন।

প্রশ্ন ২: কেন স্বপ্নে উড়তে বা পড়ে যেতে দেখি?
উত্তর: নির্দিষ্ট একটি নিশ্চিত কারণ বিজ্ঞান এখনও জানে না। উড়ার স্বপ্ন অনেক সময় স্বাধীনতার অনুভূতি বা শরীরের ভারসাম্য-সংক্রান্ত সংকেতের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু এটা অনুমানমাত্র।

প্রশ্ন ৩: বারবার একই স্বপ্ন দেখলে কী বোঝায়?
উত্তর: বারবার ফিরে আসা স্বপ্ন প্রায়ই অমীমাংসিত দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। এটা নিজে কোনো রোগ নয়, তবে খুব বিরক্তিকর হলে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।

প্রশ্ন ৪: প্রাণীরাও কি স্বপ্ন দেখে?
উত্তর: অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে REM ঘুম দেখা যায় এবং ইঁদুরের মস্তিষ্কে দিনের অভিজ্ঞতার মতো কার্যকলাপ পুনরাবৃত্ত হতে দেখা গেছে। তবে প্রাণীরা ঠিক কী "অনুভব" করে, তা আমরা সরাসরি জানতে পারি না।

প্রশ্ন ৫: স্বপ্ন কি ভবিষ্যৎ বলে দেয়?
উত্তর: না, এর পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কখনও কখনও মনে হতে পারে স্বপ্ন সত্যি হয়েছে, কিন্তু এটা সাধারণত কাকতালীয় ঘটনা বা স্মৃতির পক্ষপাত (আমরা মেলা স্বপ্ন ভুলে যাই, কেবল মিলে যাওয়াটাই মনে রাখি)।

প্রশ্ন ৬: কম ঘুমালে কি স্বপ্ন কমে?
উত্তর: ঘুম কম হলে REM ঘুমও কমতে পারে। পরে ঘুম পুষিয়ে নিলে অনেক সময় REM ঘুম বেশি হয় (REM rebound), এবং তখন স্বপ্নও বেশি স্পষ্ট ও ঘন মনে হতে পারে।


উপসংহার

তাহলে কেন আমরা স্বপ্ন দেখি? সৎ উত্তর হলো: বিজ্ঞান এখনও নিশ্চিত নয়। আমাদের হাতে আছে কয়েকটি আকর্ষণীয় তত্ত্ব, স্মৃতি গোছানো, আবেগ সামলানো, বিপদের মহড়া, মস্তিষ্কের অঞ্চল সক্রিয় রাখা, বিশ্ব-মডেল হালনাগাদ। এর কোনোটাই একা পুরো ছবি দেয় না, আর হয়তো স্বপ্ন একাধিক কাজ একসঙ্গে করে।

যা নিশ্চিত: ঘুম আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীরের জন্য অপরিহার্য, আর স্বপ্ন সেই ঘুমের একটি স্বাভাবিক, গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরের বার যখন অদ্ভুত কোনো স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙবে, মনে রাখবেন, আপনার মস্তিষ্ক তখন চুপচাপ বসে ছিল না। সে কাজ করছিল, আর কী কাজ, সেই প্রশ্নের শেষ উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনও খুঁজছেন।

নিজের মস্তিষ্ক নিয়ে আরও জানতে চান? পড়ুন মানব মস্তিষ্কের অজানা রহস্য।


আপনার মতামত জানান

আপনার সবচেয়ে অদ্ভুত বা স্মরণীয় স্বপ্ন কোনটি? কমেন্টে জানান। আর লেখাটি ভালো লাগলে বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন, এবং Dorpon-এর পরবর্তী রহস্য ও বিজ্ঞানের লেখা পেতে ব্লগটি ফলো করুন।

পরবর্তী আর্টিকেল: "টাইম ট্রাভেল কি সম্ভব? — আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে বাস্তবতা"

সম্পর্কিত পোস্ট:

No comments

Powered by Blogger.