ঘুমের মধ্যে মানুষ কেন হাঁটে? — Sleepwalking-এর বৈজ্ঞানিক রহস্য
রাতের অন্ধকারে জেগে ওঠে ঘুমন্ত মানুষ
রাত তখন প্রায় দুইটা। বাড়ির সবাই ঘুমে। হঠাৎ মা দেখলেন তার ৮ বছরের ছেলে বিছানা ছেড়ে উঠে রান্নাঘরের দিকে হাঁটছে। চোখ খোলা, কিন্তু দৃষ্টি ফাঁকা। কথা বলছে — কিন্তু কথার মাথামুণ্ডু নেই। মা ডাকলেন — কোনো সাড়া নেই। কিছুক্ষণ পর ছেলে নিজেই আবার বিছানায় ফিরে গেল।
পরদিন সকালে জিজ্ঞেস করতে ছেলে অবাক — "আমি রাতে উঠেছিলাম? কিছুই মনে নেই।"
এটা কোনো ভুতের গল্প নয়। এটা Sleepwalking বা ঘুমের মধ্যে হাঁটা — বিজ্ঞানের ভাষায় Somnambulism। পৃথিবীর প্রায় ২০% শিশু এবং ৩% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।
কিন্তু কেন হয় এটা? ঘুমন্ত মানুষ কীভাবে চোখ মেলে হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে — অথচ পরদিন কিছুই মনে থাকে না? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্কের এক অদ্ভুত রহস্যের মধ্যে।
আজকের এই লেখায় আমরা জানব Sleepwalking-এর বৈজ্ঞানিক কারণ, কাদের বেশি হয়, কোন কোন ঘটনা ঘটেছে ইতিহাসে — এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — এটা কি বিপজ্জনক
Sleepwalking আসলে কী?
Sleepwalking হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে মানুষ ঘুমের মধ্যেই উঠে হাঁটাহাঁটি করে, কথা বলে — কিন্তু সে সম্পূর্ণ অচেতন থাকে। চোখ খোলা থাকলেও দৃষ্টি থাকে ফাঁকা ও আবছা।
বিজ্ঞানের ভাষায় এটা হলো Parasomnia — ঘুমের একটি বিশেষ বিকার। এই অবস্থায় মানুষের মস্তিষ্কের কিছু অংশ জেগে থাকে এবং কিছু অংশ ঘুমিয়ে থাকে — একই সাথে।
Sleepwalking-এর সময় একজন মানুষ যা করতে পারে:
- বিছানা ছেড়ে উঠে হাঁটা
- কথা বলা — কিন্তু অর্থহীন
- রান্নাঘরে গিয়ে খাবার খোঁজা
- বাড়ির বাইরে চলে যাওয়া
- এমনকি গাড়ি চালানো — হ্যাঁ, এটা সত্য!
এবং পরদিন সকালে উঠে কিছুই মনে থাকে না।
মস্তিষ্কে কী হয় Sleepwalking-এর সময়?
এটাই সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ।
ঘুমের ধাপগুলো বুঝুন প্রথমে
আমাদের ঘুম চারটি ধাপে হয়:
ধাপ ১ — হালকা ঘুম: ঘুম সবে শুরু। সহজেই জেগে ওঠা যায়।
ধাপ ২ — মাঝারি ঘুম: শরীর ধীরে ধীরে শিথিল হচ্ছে।
ধাপ ৩ — গভীর ঘুম (N3/Slow Wave Sleep): এটাই সবচেয়ে গভীর ঘুম। মস্তিষ্ক অত্যন্ত ধীর তরঙ্গে কাজ করে। এই সময় জাগানো খুব কঠিন।
ধাপ ৪ — REM ঘুম: স্বপ্ন দেখার সময়। মস্তিষ্ক আবার সক্রিয় হয়।
Sleepwalking কোথায় হয়?
Sleepwalking হয় গভীর ঘুমের ধাপে — N3 বা Slow Wave Sleep-এ। এই সময় মস্তিষ্ক আধা-জাগা আধা-ঘুমের একটি অদ্ভুত অবস্থায় আটকে যায়। মস্তিষ্কের কিছু অংশ শরীর নাড়ানোর জন্য যথেষ্ট সক্রিয় — কিন্তু চেতনার অংশ এখনো ঘুমিয়ে।
সহজ ভাষায় বললে: কল্পনা করুন আপনার শরীর একটি গাড়ি। Sleepwalking-এর সময় গাড়ির ইঞ্জিন চলছে এবং চাকাও ঘুরছে — কিন্তু ড্রাইভার ঘুমিয়ে আছে।
মস্তিষ্কের দুই অংশ — দুই অবস্থায়
Sleepwalking মূলত NREM ঘুমের একটি বিকার। এটা স্বপ্নের সাথে সম্পর্কিত নয় — বরং এটা হয় যখন ঘুমন্ত মানুষ সবচেয়ে গভীর ঘুমে থাকে, যে সময় সাধারণত স্বপ্নই দেখা যায় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, Sleepwalking-এর সময় EEG (মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিমাপের যন্ত্র) দিয়ে দেখলে মস্তিষ্কের একাংশে জেগে থাকার মতো তরঙ্গ এবং অন্য অংশে ঘুমের তরঙ্গ একই সাথে দেখা যায়।
এই "দুই দুনিয়ার মাঝে আটকে থাকা" অবস্থাটাই Sleepwalking-এর মূল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
কেন হয় Sleepwalking? — ৭টি কারণ
১. জিনগত কারণ — সবচেয়ে নিশ্চিত
বাবা-মায়ের মধ্যে একজন যদি Sleepwalking করেন, তাহলে তাদের সন্তানের Sleepwalking হওয়ার সম্ভাবনা ৪৭%। আর বাবা-মা দুজনেরই ইতিহাস থাকলে সেই সম্ভাবনা বেড়ে যায় ৬২% পর্যন্ত।
বিজ্ঞানীরা chromosome 6-এ একটি বিশেষ জিন আবিষ্কার করেছেন — HLA-DQB1*05 — যা Sleepwalking-এর সাথে সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৫% Sleepwalker-এর এই বিশেষ জিন আছে, যেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে এটা মাত্র ১৩% — অর্থাৎ এই জিন থাকলে Sleepwalking-এর সম্ভাবনা তিনগুণ বেড়ে যায়।
২. ঘুমের অভাব
যে মানুষেরা পর্যাপ্ত ঘুমান না, তারা Sleepwalking করার সময় আরও জটিল কাজ করতে পারেন। মানে ঘুম কম হলে Sleepwalking-এর মাত্রা বাড়তে পারে।
৩. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
মানসিক চাপ, শৈশবের ট্রমা এবং PTSD Sleepwalking-এর ঝুঁকি বাড়ায় — কারণ মানসিক চাপ ঘুমের স্বাভাবিক ধাপগুলো ভেঙে দেয় এবং ঘুমের মধ্যে আংশিক জাগরণ ঘটায়।
৪. মদ্যপান
রাতে ঘুমানোর আগে মদ্যপান ঘুমের স্বাভাবিক চক্র নষ্ট করে। এটা Sleepwalking এপিসোড শুরু করার একটি পরিচিত কারণ।
৫. জ্বর ও অসুস্থতা
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বর হলে Sleepwalking বেড়ে যায়। জ্বরের সময় মস্তিষ্কের তাপমাত্রা বাড়ে এবং ঘুমের ধাপগুলো অস্বাভাবিক হয়।
৬. কিছু ওষুধ
ঘুমের ওষুধ, অ্যান্টিহিস্টামিন এবং কিছু মানসিক রোগের ওষুধ Sleepwalking-এর কারণ হতে পারে।
৭. অন্য ঘুমের সমস্যা
Sleepwalking-এর সাথে আরও কিছু ঘুমের সমস্যার সম্পর্ক আছে — যেমন ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করা (Bruxism), ঘুমের মধ্যে কথা বলা (Somniloquy), এবং শিশুদের রাতের আতঙ্ক (Night Terrors)।
কাদের বেশি হয়?
শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
পৃথিবীতে প্রায় ২০% ঘুমন্ত শিশু রাতের ছোট্ট ঘণ্টাগুলোতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটা কমে আসে। বেশিরভাগ শিশুর কিশোর বয়সে Sleepwalking বন্ধ হয়ে যায়।
কেন শিশুদের বেশি হয়? কারণ শিশুদের মস্তিষ্ক এখনো পুরোপুরি পরিপক্ক নয়। ঘুমের বিভিন্ন ধাপের মধ্যে পরিবর্তন তাদের ক্ষেত্রে আরও অস্থির।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে
প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ৩% Sleepwalking করেন। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের Sleepwalking সাধারণত শৈশব থেকে চলে আসা অথবা মানসিক চাপ বা অসুস্থতার কারণে নতুন করে শুরু হওয়া।
ইতিহাসের সবচেয়ে অবাক করা Sleepwalking-এর ঘটনা
ঘটনা ১ — ঘুমের মধ্যে খুন?
১৯৮৭ সালে কানাডার Kenneth Parks নামের এক ব্যক্তি ঘুমের মধ্যে গাড়ি চালিয়ে ২৩ কিলোমিটার দূরে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটান — এবং আদালতে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। কারণ প্রমাণিত হয়েছিল সে Sleepwalking অবস্থায় ছিল।
এই মামলা আজও আইন ও বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত।
ঘটনা ২ — ছাদে ঘুমন্ত মেয়ে
২০০৫ সালে লন্ডনে এক ১৫ বছরের মেয়ে Sleepwalking অবস্থায় ১৫ মিটার উঁচু ক্রেনের মাথায় উঠে ঘুমিয়ে পড়েছিল। উদ্ধারকারীরা তাকে না জাগিয়ে সাবধানে নামিয়ে আনে — কারণ হঠাৎ জাগালে পড়ে যেতে পারত।
ঘটনা ৩ — ঘুমের মধ্যে রান্না
অনেকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে তারা Sleepwalking-এর সময় রান্নাঘরে গিয়ে রান্না করে ফেলেছেন — ডিম ভাজা, সন্দেশ বানানো — এবং পরদিন সকালে খাবার দেখে নিজেরাই অবাক।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে Sleepwalking-এর সময় মস্তিষ্ক কতটা জটিল কাজ করতে পারে — অথচ সচেতন মনে কোনো স্মৃতি থাকে না।
Sleepwalking কি বিপজ্জনক?
সরাসরি উত্তর — হ্যাঁ, হতে পারে।
Sleepwalking নিজে বিপজ্জনক নয়, কিন্তু Sleepwalking-এর সময় যা ঘটে সেটা বিপজ্জনক হতে পারে:
- সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়া
- বাড়ির বাইরে চলে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া
- রান্নাঘরে আগুন লাগানো
- রাস্তায় বেরিয়ে দুর্ঘটনা
সবচেয়ে বিপজ্জনক মিথ: "ঘুমন্ত মানুষকে জাগালে মারা যায়।" এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ঘুমন্ত মানুষকে জাগানো নিরাপদ — শুধু হঠাৎ জাগলে সে ভয় পেতে পারে এবং কিছুক্ষণ বিভ্রান্ত থাকতে পারে।
ঘুমন্ত মানুষকে দেখলে কী করবেন?
যদি পরিবারে কেউ Sleepwalking করে, এই নিয়মগুলো মেনে চলুন:
করবেন:
- শান্তভাবে তাকে বিছানায় নিয়ে যান
- আস্তে আস্তে গাইড করুন — জোর করবেন না
- বাড়ির দরজা লক রাখুন রাতে
- সিঁড়িতে গেট লাগান
করবেন না:
- জোরে ডাকবেন না বা ধাক্কা দেবেন না
- আলো জ্বালিয়ে দেবেন না হঠাৎ
- ঘুম থেকে জোর করে জাগাবেন না
Sleepwalking ঠিক হয় কীভাবে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসার দরকার হয় না — বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বয়সের সাথে নিজেই সেরে যায়।
তবে যদি নিয়মিত হয় বা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে:
১. ঘুমের নিয়ম ঠিক করুন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও জাগা।
২. মানসিক চাপ কমান: যোগব্যায়াম, ধ্যান বা কাউন্সেলিং।
৩. ঘুমের আগে স্ক্রিন বন্ধ করুন: ফোন বা TV বন্ধ রাখুন ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে।
৪. ডাক্তারের পরামর্শ: গুরুতর ক্ষেত্রে Sleep Specialist দেখান। কিছু ওষুধ এবং Anticipatory Awakening পদ্ধতিতে চিকিৎসা হয় — যেখানে Sleepwalking শুরু হওয়ার আগেই রোগীকে জাগিয়ে দেওয়া হয়।
বিজ্ঞান কি Sleepwalking সম্পূর্ণ বুঝতে পেরেছে?
সৎ উত্তর হলো — না।
বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন Sleepwalking-এর শুধু একটাই কারণ — জিন। বাকি কারণগুলো সম্পর্কে গবেষণা এখনো চলছে।
মস্তিষ্কের কোন নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এই "আধা-জাগা আধা-ঘুমের" অবস্থা তৈরি করে — সেটা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। ২০২৬ সালেও Sleep Medicine-এ এটি একটি সক্রিয় গবেষণা ক্ষেত্র।
হয়তো এই রহস্যের উত্তর মিললে আমরা ঘুমের আরও গভীর রহস্য বুঝতে পারব।
মজার কিছু তথ্য
🌙 Sleepwalking সম্পর্কে অবাক করা তথ্য:
- Sleepwalking সাধারণত ঘুমানোর প্রথম ১-২ ঘণ্টার মধ্যে হয় — যখন গভীর ঘুমের ধাপ থাকে।
- একটি Sleepwalking এপিসোড সাধারণত ৩০ সেকেন্ড থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
- Sleepwalking-এর সময় চোখ খোলা থাকে কিন্তু দৃষ্টি অস্পষ্ট — কাছের জিনিস দেখতে পারে কিন্তু স্পষ্ট নয়।
- পূর্ণিমার রাতে Sleepwalking বেশি হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন — কিন্তু বিজ্ঞান এটা প্রমাণ করেনি।
- ইতিহাসে বিখ্যাত অনেক মানুষ Sleepwalking করতেন বলে জানা যায় — যেমন স্যার আইজাক নিউটন।
রাতের এই রহস্য আপনার ভেতরেই
ঘুমের মধ্যে হাঁটা — এই ঘটনাটা মানুষকে হাজার বছর ধরে ভয় পাইয়েছে, কৌতূহলী করেছে। একসময় মনে করা হতো এটা ভুতের কাজ, বা শয়তানের প্রভাব।
এখন বিজ্ঞান জানে — এটা মস্তিষ্কের একটা অদ্ভুত কিন্তু সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা। ঘুম ও জাগরণের সীমানায় আটকে পড়া মস্তিষ্ক তার নিজস্ব নিয়মে চলতে থাকে।
তবু অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো নেই। কেন কেউ কেউ Sleepwalking করে আর অধিকাংশ মানুষ করে না? মস্তিষ্কের ঠিক কোন প্রক্রিয়া এই অবস্থা তৈরি করে? এই রহস্যগুলো এখনো বিজ্ঞানীদের ভাবাচ্ছে।
আর সেটাই হয়তো ঘুমকে এত আকর্ষণীয় করে তোলে — রাতের অন্ধকারে, আমাদের মাথার ভেতরে, এখনো অনেক রহস্য ঘুমিয়ে আছে।
আপনার মতামত জানান
আপনার পরিবারে কি কেউ Sleepwalking করে? নাকি আপনি নিজে কখনো এই অভিজ্ঞতার কথা শুনেছেন? নিচে কমেন্টে আপনার গল্প শেয়ার করুন!
এই আর্টিকেলটি আপনার বন্ধু ও পরিবারের সাথে শেয়ার করুন — কারণ Sleepwalking সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা জরুরি।
আরও পড়ুন
- মানব মস্তিষ্কের ৭টি অসাধারণ রহস্য — বিজ্ঞানীরা এখনো উত্তর খুঁজছেন
- অমর জেলিফিশ: যে প্রাণী কখনো মরে না
- পৃথিবীর ৫টি সবচেয়ে রহস্যময় স্থান



Post a Comment