মহাকাশ বিজ্ঞানে মহাকাব্যিক মাইলফলক: পৃথিবী থেকে ১ আলোক-দিবস দূরে পৌঁছে যাচ্ছে ভয়েজার ১
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী এবং দীর্ঘতম মহাকাশ অভিযানের নাম 'ভয়েজার ১' (Voyager 1)। ১৯৭৭ সালে যখন এই মহাকাশযানটি পৃথিবী ছেড়েছিল, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি এটি একদিন আমাদের সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে এমন এক জায়গায় পৌঁছাবে যেখানে মানুষের ছোঁয়া তো দূরের কথা, চিন্তাও পৌঁছানো কঠিন।
আজ আমরা সেই মাহেন্দ্রক্ষণের মুখোমুখি। ভয়েজার ১ এখন পৃথিবী থেকে প্রায় "১ আলোক-দিবস (One Light-day)" দূরত্বে অবস্থান করছে। অর্থাৎ, আলো এক দিনে যতটা পথ অতিক্রম করে, আমাদের তৈরি একটি যন্ত্র আজ সেই অবিশ্বাস্য দূরত্বে।
এক আলোক-দিবস: গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
একজন সাধারণ মানুষের কাছে 'এক আলোক-দিবস' শব্দটা কিছুটা ধোঁয়াশাপূর্ণ মনে হতে পারে। সহজভাবে বললে, আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। এই গতিতে এক বছরে আলো যতটা দূরত্ব যায়, তাকে আমরা বলি 'আলোকবর্ষ'।
সেই হিসেবে, এক আলোক-দিবস হলো আলো ২৪ ঘণ্টায় যে দূরত্ব অতিক্রম করে। গাণিতিক সমীকরণটি লক্ষ্য করুন:
যেখানে:
* c (আলোর গতি) \approx 299,792,458 মিটার/সেকেন্ড।
* t (সময়) = ২৪ ঘণ্টা (বা ৮৬,৪০০ সেকেন্ড)।
এই হিসাব অনুযায়ী, ১ আলোক-দিবস হলো প্রায় ২৫.৯ বিলিয়ন কিলোমিটার (বা ২,৫৯০ কোটি কিলোমিটার)। ভয়েজার ১ এখন আমাদের থেকে ঠিক এতটাই দূরে যে, সেখান থেকে একটি রেডিও সিগন্যাল পৃথিবীতে আসতে সময় নেয় প্রায় ২৪ ঘণ্টা। অর্থাৎ, আপনি যদি আজ ভয়েজারকে কোনো বার্তা পাঠান, তবে তার উত্তর পেতে আপনার মোট ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগবে।
ভয়েজার ১-এর অবিশ্বাস্য যাত্রা: ১৯৭৭ থেকে ২০২৬
ভয়েজার ১ এবং তার যমজ ভয়েজার ২ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল মূলত বৃহস্পতি এবং শনি গ্রহ পর্যবেক্ষণের জন্য। কিন্তু এর স্থায়িত্ব এবং কার্যক্ষমতা বিজ্ঞানীদের সমস্ত প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে।
যাত্রাপথের প্রধান মাইলফলকসমূহ:
১৯৭৯: বৃহস্পতি গ্রহের অত্যন্ত কাছ দিয়ে উড়ে যাওয়া এবং এর চারপাশের বলয় ও উপগ্রহগুলোর ছবি পাঠানো।
১৯৮০: শনি গ্রহের বলয় এবং এর উপগ্রহ টাইটান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ।
১৯৯০: পৃথিবী থেকে ৬ বিলিয়ন কিলোমিটার দূর থেকে বিখ্যাত 'Pale Blue Dot' বা 'ফ্যাকাশে নীল বিন্দু'র ছবি তোলা।
২০১২:প্রথম মানবসৃষ্ট বস্তু হিসেবে 'হেলিওপজ' (Heliopause) অতিক্রম করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে (Interstellar Space) প্রবেশ।
২০২৬: পৃথিবী থেকে ১ আলোক-দিবস দূরত্বে পৌঁছানো।
আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে কী করছে ভয়েজার?
সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে ভয়েজার এখন যেখানে বিচরণ করছে, তাকে বলা হয় 'কসমিক ওশান' বা মহাজাগতিক সমুদ্র। এখানকার পরিবেশ আমাদের সৌরজগতের চেয়ে একদম আলাদা।
১. **প্লাজমা ঘনত্ব পরিমাপ:** ভয়েজার সেখানকার প্লাজমার ঘনত্ব এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের তথ্য পাঠাচ্ছে, যা আমাদের ছায়াপথ (Milky Way) সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে।
২. **মহাজাগতিক রশ্মি (Cosmic Rays):** সূর্যের সুরক্ষা বলয়ের বাইরে মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাব কেমন, তা ভয়েজার থেকে জানা যাচ্ছে।
প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ এবং ভয়েজারের আয়ু
এত দূরে থাকা একটি মহাকাশযানের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। নাসার **ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক (Deep Space Network)** নামক বিশাল অ্যান্টেনা ব্যবহার করে এই দুর্বল সিগন্যালগুলো ধরা হয়।
বিদ্যুৎ সমস্যা:
ভয়েজার ১ চলে তিনটি **রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটরের (RTG)** সাহায্যে। এর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে প্লুটোনিয়াম-২৩৮। তবে সময়ের সাথে সাথে এই জেনারেটরের ক্ষমতা কমছে। প্রতি বছর এর পাওয়ার ৪ ওয়াট করে কমে যাচ্ছে। এই শক্তির অপচয় রোধ করতে নাসা ইতিমধ্যেই ভয়েজারের অনেকগুলো বৈজ্ঞানিক যন্ত্র এবং হিটার বন্ধ করে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক কারিগরি ত্রুটি:
সম্প্রতি ভয়েজার ১-এর অনবোর্ড কম্পিউটার সিস্টেমে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল, যার ফলে এটি অর্থহীন তথ্য পাঠাচ্ছিল। কিন্তু নাসার প্রকৌশলীরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কয়েক দশকের পুরনো কোড ব্যবহার করে সেই সমস্যা সমাধান করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ভয়েজার এখনও বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে।
সোনার রেকর্ড: এলিয়েনদের জন্য আমাদের বার্তা
ভয়েজার ১-এর সাথে একটি ১২ ইঞ্চি মাপের সোনার প্রলেপ দেওয়া তামার রেকর্ড রয়েছে। যদি কখনও কোনো উন্নত ভিনগ্রহী সভ্যতা এটি খুঁজে পায়, তবে তারা পৃথিবীর মানুষের পরিচয় জানতে পারবে। এই রেকর্ডে রয়েছে:
৫৫টি ভাষায় অভিবাদন (যার মধ্যে **বাংলা ভাষা** অন্যতম: "নমস্কার, বিশ্বের শান্তিবাহক হোন")।
পৃথিবীর প্রাকৃতিক শব্দ (বৃষ্টি, বজ্রপাত, পশুপাখির ডাক)।
বিখ্যাত সব সংগীত (মোৎসার্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্কৃতির লোকজ গান)।
১১৫টি ছবি, যা মানুষের জীবনযাত্রা এবং বিজ্ঞানের পরিচয় দেয়।
ভয়েজার আমাদের কী শেখায়?
ভয়েজার ১-এর এক আলোক-দিবস দূরত্বে পৌঁছানো কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি মানুষের অদম্য কৌতূহলের প্রতীক। যখন এই মহাকাশযানের শক্তি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে এবং এটি চিরতরে নীরব হয়ে যাবে, তখনও এটি মহাকাশের অন্ধকারে ভেসে বেড়াবে। হয়তো কোটি বছর পর এটি অন্য কোনো নক্ষত্রপুঞ্জে পৌঁছাবে।
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কতটা ক্ষুদ্র, আবার আমাদের স্বপ্নগুলো কতটা বিশাল। ভয়েজার ১ আমাদের এক নিঃসঙ্গ কিন্তু সাহসী বার্তাবাহক, যে অন্ধকার মহাকাশে পৃথিবীর প্রতিনিধিত্ব করছে।

Post a Comment