ইরানের নারী বিজ্ঞানীরা — যাঁদের প্রতিভায় চমকে গেছে সারা বিশ্ব
ইরানের নারী বিজ্ঞানীরা — যাঁদের প্রতিভায় চমকে গেছে সারা বিশ্ব
হিজাবের আড়ালে লুকিয়ে নেই অন্ধকার — বরং জ্বলছে মেধার আলো। ইরানি নারীরা আজ বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও চিকিৎসায় দুনিয়াকে পথ দেখাচ্ছেন।
পশ্চিমা মিডিয়ায় ইরানের নারীদের নিয়ে যে ছবি আঁকা হয়, তা প্রায়ই একপাক্ষিক। কিন্তু পরিসংখ্যান ও তথ্য-প্রমাণ একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলে। ইরানের নারীরা আজ বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত ও দক্ষ পেশাদারদের মধ্যে গণ্য হচ্ছেন — বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা এবং গবেষণায় তাঁরা যে সাফল্য অর্জন করেছেন, তা সত্যিই অভূতপূর্ব।
শিক্ষায় বিপ্লব: বিশ্বকে পেছনে ফেলে দিয়েছে ইরান
ইরানের নারী শিক্ষার যাত্রাটি চমকপ্রদ। ২০০৬ সালে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারীরা মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকেরও বেশি হয়ে যান। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে ইরানের উচ্চশিক্ষায় প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০ লাখেরও বেশি ছিলেন নারী। এই সংখ্যার নিরিখে ইরান চীন, ভারত, আমেরিকা ও ব্রাজিলের পরেই বিশ্বে পঞ্চম স্থানে ছিল।
প্রকৌশল বিভাগে ইরানি নারীদের ভর্তির হার একসময় বিশ্বে প্রথম স্থানে ছিল, এবং বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় — শুধুমাত্র আমেরিকার পরে।
আজকের দিনেও পরিস্থিতি ঈর্ষণীয়। ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষার্থীর হার ৫৬ থেকে ৬৩ শতাংশ, কোনো কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
- ইরান — ৩৫–৬০% (জীববিজ্ঞান ও রসায়নে ৬০–৭০%)
- যুক্তরাষ্ট্র — ২২–৪০%
- ভারত — ২৫–৪৩%
- বৈশ্বিক গড় — ৩৫%
গণিতের নোবেল জয়ী: মারইয়াম মির্জাখানি
ইরানি নারী বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম নিঃসন্দেহে মারইয়াম মির্জাখানি।
মারইয়াম মির্জাখানি ছিলেন প্রথম নারী এবং প্রথম ইরানি যিনি ফিল্ডস মেডেল অর্জন করেন — গণিতের এই পুরস্কারকে প্রায়ই "গণিতের নোবেল পুরস্কার" বলা হয়। ২০০৮ সালে তিনি মাত্র ৩১ বছর বয়সে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের পূর্ণ অধ্যাপক হন।
তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল টাইখমুলার তত্ত্ব, হাইপারবোলিক জ্যামিতি, আর্গোডিক তত্ত্ব এবং সিম্পলেকটিক জ্যামিতি। ২০১৬ সালে তিনি আমেরিকার ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস-এর সদস্য নির্বাচিত হন — প্রথম ইরানি নারী হিসেবে।
মির্জাখানির গল্পটি শুধু পুরস্কারের নয়। তাঁর জীবন একটি অনুপ্রেরণার আখ্যান। তেহরানের একটি স্কুল থেকে শুরু করে হার্ভার্ডে পিএইচডি, তারপর স্ট্যানফোর্ডে অধ্যাপনা — এই যাত্রাপথে তিনি দেখিয়েছেন মেধার সামনে কোনো বাধাই চিরন্তন নয়।
"অনেক মানুষ নানা পরিস্থিতিতে গণিত উপভোগ করতে পারেন না। কিন্তু আমি চাই ভবিষ্যতে মেয়েরা এমন একটি পরিবেশ পাক যেখানে তারা মুক্তভাবে স্বপ্ন দেখতে পারে।"
— মারইয়াম মির্জাখানিচিকিৎসা বিজ্ঞানে নারীর আধিপত্য
চিকিৎসা বিভাগে ইরানি নারীরা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী। সক্রিয় চিকিৎসক ও মেডিকেল রেসিডেন্টদের মধ্যে নারীর অংশীদারিত্ব ৫০ শতাংশের বেশি — যেখানে আমেরিকায় এই সংখ্যা মাত্র ৩৮ থেকে ৫০ শতাংশ এবং ভারতে মাত্র ১৮ থেকে ২৮ শতাংশ।
ইরানের হাসপাতালগুলোতে নারী চিকিৎসকরা শুধু সংখ্যায় নয়, দক্ষতায়ও সমান। জটিল অস্ত্রোপচার, ক্যান্সার চিকিৎসা, জিন থেরাপি — সবখানেই তাঁদের উপস্থিতি স্পষ্ট।
বিশ্বের শীর্ষ গবেষকদের তালিকায় ইরানি নারী
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও এলসেভিয়ার ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে যে ৬০ জন ইরানি নারী গবেষক ক্লিনিকাল মেডিসিন, রসায়ন, বায়োমেডিসিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ন্যানো প্রযুক্তি, পদার্থবিজ্ঞান এবং প্রকৌশলসহ আটটি বিষয়ে বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের মধ্যে রয়েছেন।
ISC-এর তালিকায় ১৩৫ জনেরও বেশি ইরানি নারী গবেষক বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশের মধ্যে স্থান পেয়েছেন।
- ক্লিনিকাল মেডিসিন ও বায়োমেডিসিন
- রসায়ন ও ন্যানো প্রযুক্তি
- কৃ
ত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটার বিজ্ঞান - পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান
- প্রকৌশল ও উপকরণ বিজ্ঞান
- পরিবেশ বিজ্ঞান ও কৃষি
- জিন থেরাপি ও ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি
প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে নারীর পদচিহ্ন
ইরানে প্রকৌশল বিভাগে নারী স্নাতকের হার ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশ — যা ভারতের ২৯ শতাংশের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। শরীফ বিশ্ববিদ্যালয় অব টেকনোলজিতে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ৫৫ শতাংশ পিএইচডি ধারী হলেন নারী।
কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ইরানি নারীরা আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা ও হ্যাকাথনে শীর্ষ স্থান অধিকার করছেন। মোনা জাররাহি ওবামার দেওয়া "Outstanding Young Professional Talent of the Year" পুরস্কারে ১০২ জন প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র ইরানি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিশ্বমঞ্চে ইরানের স্থান
| সূচক | ইরান | যুক্তরাষ্ট্র | ভারত |
|---|---|---|---|
| বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থী | ৫৬–৬৩% | ৫৬–৫৮% | ৪৭–৪৯% |
| নারী চিকিৎসক | ৫০–৬০% | ৩৮–৫০% | ১৮–২৮% |
| নারী প্রকৌশল স্নাতক | ৩৫–৪২% | ২০–২৫% | ২৯% |
| তারুণ্য নারী সাক্ষরতা | ~৯৯% | ৯৯% | ৮৮–৯০% |
বাধা আছে, তবু থামেননি
সত্যিকারের চিত্র তুলে ধরতে হলে কিছু বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে। ইরানে নারীরা কিছু সামাজিক ও আইনি সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। চাকরির বাজারে তাঁদের অংশগ্রহণের হার এখনও কম — ILO-এর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী মাত্র ১৪–১৮ শতাংশ।
কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ এবং নানা সামাজিক বাধা সত্ত্বেও ইরানের নারীরা জ্ঞানের পথে এগিয়ে গেছেন।
"ইরানের মডেল — প্রতিকূলতার মাঝেও নারী সাক্ষরতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া — উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি পাঠ।"
— হাসনাইন নাকভি, ইতিহাসবিদ ও লেখকউপসংহার: স্টেরিওটাইপের বাইরে এক নতুন বাস্তবতা
ইরানের নারীদের সম্পর্কে যে গতানুগতিক ধারণা প্রচলিত আছে, তথ্য-প্রমাণ তার অনেকখানি খণ্ডন করে। মারইয়াম মির্জাখানি গণিতের সর্বোচ্চ পুরস্কার জিতেছেন, শত শত ইরানি নারী গবেষক বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশে জায়গা করে নিয়েছেন, আর হাসপাতাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম — সর্বত্র তাঁদের উপস্থিতি।
এই সাফল্য কোনো প্রচারের ফল নয়, এটি পরিশ্রম, মেধা ও দৃঢ়তার ফল। ইরানের নারীরা বিশ্বকে বলছেন — মেধার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।
আপনি কি জানতেন?
মারইয়াম মির্জাখানির জন্মদিন ১২ মে আন্তর্জাতিক গণিতে নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়। তাঁর স্মৃতি আজও লক্ষ লক্ষ মেয়েকে বিজ্ঞান ও গণিতে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করছে।


Post a Comment