ফিউশন এনার্জি কী? সূর্যের শক্তি পৃথিবীতে আনার দৌড়
প্রতিদিন সূর্য আমাদের আলো আর তাপ দিচ্ছে, প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর ধরে। এই বিপুল শক্তির উৎস কোনো আগুন নয়, কয়লা বা তেলও নয়। সূর্যের ভেতরে প্রতি সেকেন্ডে অগণিত হাইড্রোজেন পরমাণু জুড়ে গিয়ে হিলিয়াম হচ্ছে, আর সেই প্রক্রিয়ায় মুক্ত হচ্ছে বিপুল শক্তি। এর নাম নিউক্লিয়ার ফিউশন।
এখন কল্পনা করুন, যদি এই প্রক্রিয়া পৃথিবীতে একটি যন্ত্রে ঘটানো যেত। জ্বালানি প্রায় অফুরন্ত, কার্বন নির্গমন নেই, দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় বর্জ্যও তুলনামূলক অনেক কম। এই স্বপ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন প্রায় ৭০ বছর ধরে। একটা পুরোনো রসিকতাও আছে: "ফিউশন সবসময় ৩০ বছর দূরে।"
কিন্তু ২০২২ সালের পর থেকে ছবি কিছুটা বদলেছে। আমেরিকার একটি পরীক্ষাগারে প্রথমবার ফিউশন বিক্রিয়া থেকে এমন শক্তি পাওয়া গেছে, যা জ্বালানির উপর ফেলা লেজার-শক্তির চেয়ে বেশি। তাহলে কি আমরা সত্যিই কাছাকাছি? এই লেখায় আমরা দেখব:
- ফিউশন এনার্জি কী এবং ফিশন থেকে কীভাবে আলাদা
- এটি কেন এত কঠিন
- NIF, ITER, SPARC, ও চীন-ফ্রান্সের রেকর্ড, আসলে কী অর্জিত হয়েছে
- বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুতের জন্য কতদিন লাগতে পারে এবং কোন বাধাগুলো বাকি
শুরুতেই একটা কথা: ফিউশন নিয়ে খবরে অনেক সময় "অসীম শক্তি আবিষ্কার" ধরনের শিরোনাম আসে। এই লেখায় আমরা ঠিকঠাক আলাদা করব কী অর্জিত, কী পরিকল্পিত, আর কী এখনও অনিশ্চিত।
ফিউশন এনার্জি কী?
নিউক্লিয়ার ফিউশন হলো এমন প্রক্রিয়া, যেখানে দুটি হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াস জুড়ে গিয়ে একটি ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি করে, এবং সেই সময় বিপুল শক্তি মুক্ত হয়।
কেন শক্তি মুক্ত হয়? কারণ ফিউশনের পর তৈরি নতুন নিউক্লিয়াসের ভর, মূল দুটির মোট ভরের চেয়ে সামান্য কম হয়। ওই "হারানো" ভরই আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E = mc² অনুযায়ী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। c এর বর্গ বিশাল সংখ্যা, তাই সামান্য ভরও বিপুল শক্তি দেয়।
পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজে ঘটানো যায় এমন বিক্রিয়াটি হলো:
ডিউটেরিয়াম + ট্রিটিয়াম → হিলিয়াম + একটি নিউট্রন + শক্তি
- ডিউটেরিয়াম হাইড্রোজেনের একটি ভারী রূপ। এটি সাগরের পানিতে পাওয়া যায়।
- ট্রিটিয়াম হাইড্রোজেনের আরও ভারী, তেজস্ক্রিয় রূপ। এটি প্রকৃতিতে নগণ্য পরিমাণে আছে, তাই লিথিয়াম থেকে বানানোর পরিকল্পনা করা হয়।
ফিউশন বনাম ফিশন: পার্থক্য কী?
আজকের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ফিশন (বিভাজন) ব্যবহার করে। অনেকে দুটিকে গুলিয়ে ফেলেন।
| বিষয় | ফিশন (Fission) | ফিউশন (Fusion) |
|---|---|---|
| প্রক্রিয়া | ভারী পরমাণু (যেমন ইউরেনিয়াম) ভেঙে যায় | হালকা পরমাণু জুড়ে যায় |
| ব্যবহার | আজকের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র | এখনও গবেষণা-পর্যায়ে |
| জ্বালানি | ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম | ডিউটেরিয়াম, ট্রিটিয়াম (লিথিয়াম থেকে) |
| শৃঙ্খল বিক্রিয়া | হ্যাঁ, নিয়ন্ত্রণ না করলে বিপজ্জনক | না, শর্ত ভাঙলেই প্লাজমা নিভে যায় |
| দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় বর্জ্য | বেশি, হাজার হাজার বছর | তুলনামূলক কম, তবে চুল্লির কাঠামো তেজস্ক্রিয় হয় |
| কার্বন নির্গমন | নেই | নেই |
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ফিউশন চুল্লিতে ফিশনের মতো নিয়ন্ত্রণহীন শৃঙ্খল বিক্রিয়ার ঝুঁকি নেই। কিছু ভুল হলেই প্লাজমা ঠান্ডা হয়ে বিক্রিয়া থেমে যায়। তবে "ঝুঁকিহীন" বলাটাও ঠিক নয়, কারণ চুল্লির উপাদান নিউট্রনের আঘাতে তেজস্ক্রিয় হয় এবং ট্রিটিয়াম সামলানো একটি প্রকৌশল-চ্যালেঞ্জ।
কেন ফিউশন এত কঠিন?
সূর্যের কেন্দ্রে আছে প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় চাপ, তাই সেখানে প্রায় ১.৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেই ফিউশন ঘটে। পৃথিবীতে সেই চাপ বানানো অসম্ভব। তাই বিকল্প হলো তাপমাত্রা আরও বাড়ানো, সাধারণত ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি, যা সূর্যের কেন্দ্রের চেয়েও গরম।
এত গরমে কোনো পদার্থ কঠিন বা তরল থাকে না। গ্যাস হয়ে যায় প্লাজমা, যা আয়ন ও ইলেকট্রনের গরম মিশ্রণ। প্রশ্ন হলো, এই প্লাজমাকে ধরে রাখা যাবে কীভাবে, কোনো দেয়াল তো গলে যাবে। বিজ্ঞানীরা দুটি প্রধান উপায় ব্যবহার করেন:
১. চৌম্বকীয় আবদ্ধকরণ (Magnetic Confinement)
শক্তিশালী চুম্বকের ক্ষেত্র দিয়ে প্লাজমাকে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যেন সে চুল্লির দেয়ালে না লাগে। সবচেয়ে পরিচিত নকশা টোকামাক (Tokamak): একটি ডোনাট আকৃতির চুল্লি। আরেকটি নকশা স্টেলারেটর (Stellarator), যার চুম্বক আরও জটিল পেঁচানো আকারের।
২. অভ্যন্তরীণ আবদ্ধকরণ (Inertial Confinement)
একটি ছোট জ্বালানি-কণিকাকে চারদিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী লেজার দিয়ে আঘাত করে মুহূর্তের জন্য এত চেপে ও গরম করা হয় যে ফিউশন ঘটে। আমেরিকার NIF এই পথে চলে।
মূল শর্ত: "Net Energy"
বিজ্ঞানীরা প্রায়ই "Q" নামে একটি হিসাব ব্যবহার করেন: ফিউশন থেকে পাওয়া শক্তি ÷ প্লাজমাকে গরম করতে দেওয়া শক্তি। Q > 1 মানে প্লাজমা যত শক্তি নিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে পুরো কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, সেটা আলাদা হিসাব। এই পার্থক্যটা পরে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মাইলফলক ১: NIF-এর "ignition" (২০২২)
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ন্যাশনাল ইগনিশন ফ্যাসিলিটি (NIF) ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ইতিহাস গড়ে। লেজার জ্বালানি-ক্যাপসুলে পৌঁছে দিয়েছিল প্রায় ২.০৫ মেগাজুল শক্তি, আর ফিউশন বিক্রিয়া থেকে পাওয়া গেছে প্রায় ৩.১৫ মেগাজুল। অর্থাৎ ক্যাপসুলের উপর ফেলা শক্তির চেয়ে বেশি শক্তি বেরিয়েছে। এটাই বিশ্বে প্রথম এই ধরনের "ignition" অর্জন।
এর পরের সাফল্য: প্রতিবেদন অনুযায়ী NIF-এর ফলন পরে আরও বেড়েছে। একটি সংবাদ-সূত্রে ৫.২ মেগাজুলের নতুন রেকর্ডের কথা এসেছে, আর অন্য সূত্র বলেছে "৮.৬ মেগাজুল পর্যন্ত" হয়েছে বলে LLNL নিশ্চিত করেছে। সঠিক সর্বশেষ সংখ্যা আপনি LLNL-এর অফিসিয়াল ঘোষণা থেকে মিলিয়ে নিন।
কিন্তু এটা কি বিদ্যুৎ-কেন্দ্র?
না। এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। NIF-এর লেজারগুলোকে চালাতে বিদ্যুৎ লাগে প্রায় ৩০০ মেগাজুল, যা দিয়ে মাত্র ২ মেগাজুলের মতো লেজার-আলো তৈরি হয়। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থার হিসাবে এখনও বিপুল শক্তির ঘাটতি। এছাড়া NIF দিনে বড়জোর কয়েকবার "শট" দিতে পারে, অথচ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে লাগবে প্রতি সেকেন্ডে বহুবার।
NIF-এর সাফল্য তাই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ: ফিউশন বিক্রিয়া নিজেকে টিকিয়ে রেখে শক্তি দিতে পারে। এটি বিদ্যুৎ-উৎপাদনের প্রযুক্তি এখনও নয়।
মাইলফলক ২: ITER, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফিউশন প্রকল্প
ফ্রান্সের কাদারাশে (Cadarache) তৈরি হচ্ছে ITER, ৩৫টি দেশের যৌথ প্রকল্প। ভারতও এর অংশীদার সদস্য-দেশগুলোর একটি।
- লক্ষ্য: ৫০ মেগাওয়াট গরম করার শক্তি দিয়ে ৫০০ মেগাওয়াট ফিউশন-শক্তি তৈরি করা, অর্থাৎ Q = ১০।
- ব্যয়: শুরুর অনুমান প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে এখন ২০ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি বলে একটি সূত্রে উল্লেখ আছে।
- সময়সূচি: প্রথম প্লাজমার লক্ষ্য মূলত ২০২০ সাল ছিল। বারবার পিছিয়ে এখন সেটি প্রায় ২০৩৫ সালের কাছাকাছি।
- গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা: ITER বিদ্যুৎ তৈরি করবে না। এটি একটি পরীক্ষামূলক চুল্লি, যা প্রমাণ করবে বড় মাত্রায় ফিউশন সম্ভব। বিদ্যুৎ বানানোর জন্য পরবর্তীতে "DEMO" নামের আলাদা একটি প্রদর্শনী-চুল্লি লাগবে।
ITER-এর বিলম্ব ও ব্যয়বৃদ্ধি ফিউশনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা-পরীক্ষাগুলোর একটি: এমন জটিল আন্তর্জাতিক প্রকল্প সময়মতো শেষ করা কঠিন।
মাইলফলক ৩: প্রাইভেট কোম্পানির দৌড়, SPARC
গত কয়েক বছরে সরকারি প্রকল্পের পাশে একটি নতুন শক্তি উঠে এসেছে: ব্যক্তিগত বিনিয়োগে চলা ফিউশন-স্টার্টআপ। একটি সূত্র অনুযায়ী ৪০টিরও বেশি কোম্পানি মোট ৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি তুলেছে। এই সংখ্যা বদলাচ্ছে, তাই এটিকে আনুমানিক ধরুন।
Commonwealth Fusion Systems (CFS) ও SPARC
MIT থেকে বেরিয়ে আসা এই কোম্পানি SPARC নামে একটি ছোট আকারের টোকামাক বানাচ্ছে। এর বিশেষত্ব নতুন প্রজন্মের উচ্চ-তাপমাত্রা সুপারকন্ডাক্টিং (HTS) চুম্বক, যা তুলনামূলক ছোট চুল্লিতেও শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র দিতে পারে বলে আশা করা হয়।
একটি ফিউশন-ট্র্যাকারের ২০২৬ সালের অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী:
- SPARC-এর ১৮টি টরয়েডাল চুম্বকের মধ্যে প্রথমটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বসানো হয়েছে।
- কোম্পানি জানিয়েছে, জুলাই ২০২৬-এ নির্মাণের প্রায় ৮০% সম্পূর্ণ।
- প্রথম প্লাজমার লক্ষ্য ২০২৭ সাল। একই ট্র্যাকার উল্লেখ করেছে, এই তারিখ আগে ২০২৫ থেকে ২০২৬, তারপর ২০২৭-এ সরেছে।
- লক্ষ্য: ২০২৭ সালে Q > ১, অর্থাৎ প্লাজমা গরম করতে দেওয়া শক্তির চেয়ে বেশি ফিউশন-শক্তি, এবং পরে প্রায় Q ≈ ১০ অর্জনের সম্ভাবনা।
- কোম্পানি-ব্যাপী মোট মূলধন প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার, এর মধ্যে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ১ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন তহবিল-সংগ্রহের উল্লেখ আছে।
- SPARC সফল হলে পরের ধাপে ARC নামে একটি পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ-কেন্দ্রের পরিকল্পনা আছে, তবে ARC-এর স্থান বা সময়সূচি নিয়ে নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত তথ্য আমরা পাইনি।
সততার সঙ্গে: এগুলো কোম্পানির লক্ষ্য, প্রমাণিত ফলাফল নয়। বিলম্বের ধারা দেখায়, লক্ষ্য-তারিখ সরে যাওয়া এই ক্ষেত্রে স্বাভাবিক।
অন্যান্য কোম্পানি
- Helion Energy: স্পন্দিত (pulsed) পদ্ধতিতে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরের চেষ্টা করছে।
- TAE Technologies: হাইড্রোজেন-বোরন জ্বালানি নিয়ে গবেষণা করছে, যাতে নিউট্রন তৈরি হয় না, তবে এর জন্য আরও বেশি তাপমাত্রা লাগে।
- First Light Fusion (যুক্তরাজ্য): লেজারের বদলে প্রজেক্টাইল ও শক-ওয়েভ ব্যবহারের ভিন্ন পথ নিয়েছে।
এদের সবার দাবি ও সময়সূচিই কোম্পানির ঘোষণা, স্বাধীনভাবে যাচাই-করা ফলাফল নয়।
মাইলফলক ৪: চীন ও ফ্রান্সের "দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখার" রেকর্ড
২০২৫ সালের শুরুতে দুটি রেকর্ডের খবর বেশ আলোচিত হয়:
- চীনের EAST টোকামাক প্রায় ১,০৬৬ সেকেন্ড (প্রায় ১৮ মিনিট) উচ্চ-সীমাবদ্ধ প্লাজমা ধরে রেখেছে বলে জানা যায়।
- ফ্রান্সের WEST টোকামাক এর কিছুদিন পর প্রায় ১,৩৩৭ সেকেন্ড (প্রায় ২২ মিনিট) প্লাজমা ধরে রেখে সেই রেকর্ড ভেঙেছে বলে প্রতিবেদন আছে।
এর মানে কী? এগুলো প্লাজমা স্থিতিশীল রাখার সময়ের রেকর্ড, নেট এনার্জির রেকর্ড নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হলে মাস বা বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন চলা লাগবে, কয়েক মিনিট নয়। তবুও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, কারণ চুম্বকীয় চুল্লির সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকা।
(এই সংখ্যাগুলো বিভিন্ন সংবাদ-সূত্রের শিরোনাম থেকে নেওয়া। প্রকাশের আগে গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ঘোষণা মিলিয়ে নিতে পারেন।)
বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎ কবে আসবে?
সৎ উত্তর: কেউ নিশ্চিত জানে না। তবে আলোচনায় যেসব অনুমান শোনা যায়:
- বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের মত, বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০৪০ থেকে ২০৫০-এর দশকে আসতে পারে, ২০৪০-এর দশক সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতি।
- কিছু প্রাইভেট কোম্পানি ২০৩০-এর দশকে প্রদর্শনী-চুল্লির লক্ষ্য রাখে।
- ITER-এর টেকসই ফিউশন-প্রদর্শন ২০৩০-এর দশকের শেষ দিকের আগে আশা করা হচ্ছে না।
ইতিহাস বলে, এই সময়সূচি প্রায়ই পিছিয়েছে।
ফিউশনের সামনে ৫টি বড় বাধা
১. নেট বিদ্যুৎ এখনও তৈরি হয়নি।
কোনো ফিউশন কেন্দ্র এখনও নিজের ব্যবহারের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করেনি। NIF বিক্রিয়ায় Q > ১ পেলেও পুরো কেন্দ্রের হিসাবে বিপুল ঘাটতি।
২. প্লাজমার স্থিতিশীলতা।
প্লাজমা হঠাৎ ভেঙে (disruption) চুল্লির অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মাসের পর মাস চালানো এখনও অমীমাংসিত।
৩. উপাদানের ক্ষয়।
নিউট্রনের আঘাতে চুল্লির কাঠামো ধীরে ধীরে দুর্বল ও তেজস্ক্রিয় হয়। এমন পরিবেশে টিকবে, এমন উপাদান তৈরি একটি বড় গবেষণা-ক্ষেত্র।
৪. ট্রিটিয়াম জ্বালানি।
প্রকৃতিতে ট্রিটিয়াম খুব কম। চুল্লির নিজের আবরণ (লিথিয়াম ব্ল্যাঙ্কেট) থেকে ট্রিটিয়াম বানানোর ধারণা আছে, যা নীতিগতভাবে দেখানো হয়েছে, কিন্তু চুল্লি-মাপে নয়।
৫. অর্থনীতি।
ফিউশন বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট খরচ কত হবে, তা এখনও খুবই অনিশ্চিত। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের দাম দ্রুত কমেছে, তাই ফিউশনকে প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে।
ফিউশন সাফল্য পেলে বাংলাদেশ-ভারতের মতো দেশের কী লাভ?
এখানে সতর্ক থাকা ভালো, কারণ এটি ভবিষ্যৎ-নির্ভর। সম্ভাব্য সুবিধা, যদি প্রযুক্তি সফল ও সাশ্রয়ী হয়:
- জ্বালানির আমদানি-নির্ভরতা কমা
- কার্বন-মুক্ত, বারো মাস চালু থাকা বিদ্যুৎ
- জলবায়ু-লক্ষ্য পূরণে সহায়তা
কিন্তু আজকের বাস্তবতায় এই দুই অঞ্চলের জন্য সৌরশক্তি, বায়ু ও গ্রিড-উন্নয়ন অনেক বেশি তাৎক্ষণিক ও কার্যকর সমাধান। ফিউশনকে বিকল্প নয়, দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা উচিত। সৌরশক্তি ব্যবহারের একটি সৃজনশীল উদাহরণ দেখতে পারেন আমাদের সোলার-চালিত গরম কম্বলের উদ্ভাবন লেখায়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফিউশন এনার্জি কী?
উত্তর: দুটি হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াস জুড়ে গিয়ে ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি হওয়ার সময় মুক্ত হওয়া শক্তি। সূর্য ও তারা এভাবেই শক্তি তৈরি করে।
প্রশ্ন ২: ফিউশন ও ফিশনের পার্থক্য কী?
উত্তর: ফিশনে ভারী পরমাণু ভাঙে (আজকের পারমাণবিক কেন্দ্র), ফিউশনে হালকা পরমাণু জুড়ে যায় (গবেষণা-পর্যায়ে)।
প্রশ্ন ৩: ফিউশন কি নিরাপদ?
উত্তর: ফিশনের মতো নিয়ন্ত্রণহীন শৃঙ্খল বিক্রিয়ার ঝুঁকি নেই, শর্ত ভাঙলে প্লাজমা নিভে যায়। তবে চুল্লির উপাদান তেজস্ক্রিয় হয় এবং ট্রিটিয়াম সামলাতে হয়, তাই এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিহীন নয়।
প্রশ্ন ৪: NIF কি বিদ্যুৎ তৈরি করেছে?
উত্তর: না। NIF ক্যাপসুলে ফেলা লেজার-শক্তির চেয়ে বেশি শক্তি পেয়েছে, কিন্তু লেজার চালাতে লাগা বিদ্যুতের তুলনায় তা অনেক কম। এটি বৈজ্ঞানিক মাইলফলক, বিদ্যুৎ-উৎপাদন নয়।
প্রশ্ন ৫: ITER কী?
উত্তর: ফ্রান্সে ৩৫টি দেশের যৌথ বিশাল টোকামাক প্রকল্প, যার লক্ষ্য Q = ১০ প্রমাণ করা। এটি বিদ্যুৎ তৈরি করবে না।
প্রশ্ন ৬: "কৃত্রিম সূর্য" বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: চীনসহ বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যম ফিউশন-চুল্লিকে এই নামে ডাকে। এটি একটি জনপ্রিয় নাম, বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়।
প্রশ্ন ৭: কবে ফিউশন বিদ্যুৎ ঘরে ঘরে পৌঁছাবে?
উত্তর: নিশ্চিত কেউ জানে না। বেশিরভাগ অনুমান ২০৪০-এর দশক বা তার পর, আর ইতিহাসে এই সময়সূচি প্রায়ই পিছিয়েছে।
প্রশ্ন ৮: ফিউশনের জ্বালানি কি অফুরন্ত?
উত্তর: ডিউটেরিয়াম সাগরের পানিতে প্রচুর আছে, আর ট্রিটিয়াম বানানো যায় লিথিয়াম থেকে। তাই সম্ভাব্য জ্বালানি-সম্পদ বিশাল, তবে "অসীম" বলা অতিরঞ্জন, আর লিথিয়ামও সীমিত।
ফিউশন এনার্জি কী? এটি সূর্যের নিজের শক্তির উৎসকে পৃথিবীতে নকল করার চেষ্টা। আর ২০২২-এর NIF-সাফল্য দেখিয়েছে, নীতিগতভাবে এটা সম্ভব।
যা অর্জিত:
- ফিউশন বিক্রিয়া থেকে ক্যাপসুলে ফেলা শক্তির চেয়ে বেশি শক্তি পাওয়া গেছে (NIF)।
- চুম্বকীয় চুল্লিতে প্লাজমা বহু মিনিট ধরে রাখা গেছে বলে প্রতিবেদন আছে।
- সরকারি ও বেসরকারি, দুই ধারাতেই বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে।
যা বাকি:
- পুরো কেন্দ্রের হিসাবে নেট বিদ্যুৎ
- মাস-বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন চালানো
- উপাদানের টেকসই করা, ট্রিটিয়াম-সরবরাহ ও সাশ্রয়ী খরচ
ফিউশন সম্ভবত আগামী কয়েক বছরে আপনার বিদ্যুতের বিল কমাবে না। কিন্তু এটি মানবসভ্যতার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকৌশল-প্রকল্পগুলোর একটি, এবং কয়েক দশক পরের শক্তির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। তাই খবরে "ফিউশন বিপ্লব" দেখলে উত্তেজিত হোন, কিন্তু প্রশ্নটাও করুন: এটা কি বৈজ্ঞানিক মাইলফলক, নাকি সত্যিকারের বিদ্যুৎ?
আরও আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে জানতে পড়ুন কোয়ান্টাম কম্পিউটার কী?।
আপনার মতামত জানান
আপনার কী মনে হয়, ফিউশন কি আগামী ২০ বছরে সত্যিই বিদ্যুৎ দেবে, নাকি "সবসময় ৩০ বছর দূরে" থাকবে? কমেন্টে জানান। লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন আর Dorpon ফলো করুন।
পরবর্তী আর্টিকেল: "মঙ্গল থেকে মাটি আনার মিশন — Mars Sample Return"
সম্পর্কিত পোস্ট:

Post a Comment