আরশোলা : পৃথিবীর সবচেয়ে “অমর” প্রাণী? কেন কোটি কোটি বছরেও পৃথিবী থেকে তাদের মুছে ফেলা যায়নি
রাত গভীর। রান্নাঘরের আলো জ্বালাতেই হঠাৎ দেয়ালের কোণ থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল একটি ছোট আরশোলা। আপনি বিরক্ত হয়ে সেটিকে মারার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেটি অন্ধকারের কোথাও অদৃশ্য হয়ে গেল।
এ দৃশ্য পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন দেখে। কিন্তু খুব কম মানুষই ভেবে দেখে—এত উন্নত প্রযুক্তি, এত কীটনাশক, এত আধুনিক সভ্যতা থাকার পরও কেন আমরা আরশোলাকে পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে পারিনি?
ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছে, অসংখ্য প্রাণী পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে, সাম্রাজ্য উঠেছে ও ধ্বংস হয়েছে, বরফ যুগ এসেছে ও চলে গেছে—তবুও আরশোলা টিকে আছে।
এমনকি পৃথিবীতে বহু বছর ধরে একটি জনপ্রিয় ধারণা ছড়িয়ে আছে—
“যদি কখনও পারমাণবিক যুদ্ধ পৃথিবী ধ্বংস করে দেয়, তবুও আরশোলা বেঁচে থাকবে।”
কিন্তু এই ধারণা কতটা সত্য?
আজ আমরা জানব আরশোলার কোটি বছরের ইতিহাস, তাদের অসাধারণ বেঁচে থাকার ক্ষমতা এবং কেন পৃথিবী থেকে তাদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা প্রায় অসম্ভব।
আরশোলার ইতিহাস: মানুষের চেয়েও বহু পুরোনো এক জীব
পৃথিবীতে তাদের আগমন
আরশোলা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন জীবগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি।
বিজ্ঞানীদের মতে, আরশোলা সদৃশ প্রাণীরা প্রায় ৩০০–৩২০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে ছিল। অর্থাৎ ডাইনোসরেরও বহু আগে তাদের পূর্বপুরুষ পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত।
ভাবুন—
তখন মানুষ ছিল না
আধুনিক প্রাণী ছিল না
বর্তমান মহাদেশগুলোও ছিল না
কিন্তু সেই সময়েও আরশোলা জাতীয় প্রাণী পৃথিবীতে ছিল।
কোটি বছর ধরে বদলে গেছে আরশোলা
অনেকেই মনে করেন আরশোলা কোটি বছর ধরে একই রকম ছিল।
আসলে তা পুরোপুরি সত্য নয়।
তারা সময়ের সাথে নিজেদের পরিবর্তন করেছে, পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়েছে এবং নতুন বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।
এটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কেন আরশোলাকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করা এত কঠিন?
১. তারা প্রায় সবকিছু খেতে পারে
আরশোলার অন্যতম বড় শক্তি তাদের খাদ্যাভ্যাস।
তারা খেতে পারে—
প্রাকৃতিক খাদ্য
পচা পাতা
মৃত গাছ
ফল
উদ্ভিদ
মানুষের ব্যবহার্য জিনিস
কাগজ
আঠা
সাবান
চামড়া
খাবারের ছোট টুকরো
এ কারণে পৃথিবীতে খাদ্যের অভাব হলেও তারা সহজে বেঁচে থাকতে পারে।
২. তারা লুকানোর ওস্তাদ
আরশোলা আলো পছন্দ করে না।
তারা লুকিয়ে থাকতে পারে—
দেয়ালের ফাঁকে
পাইপের ভেতরে
কাঠের স্তূপে
মাটির নিচে
আসবাবের নিচে
আপনি হয়তো মনে করছেন আপনার ঘরে মাত্র কয়েকটি আরশোলা আছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে।
কারণ দিনের অধিকাংশ সময় তারা মানুষের চোখের আড়ালে থাকে।
৩. তারা খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে
একটি স্ত্রী আরশোলা জীবনে শত শত বাচ্চা জন্ম দিতে পারে।
ধরুন—
একটি ঘরে যদি মাত্র কয়েকটি আরশোলা থাকে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, কয়েক মাসের মধ্যেই সংখ্যাটি শত কিংবা হাজারে পৌঁছে যেতে পারে।
এ কারণেই বাড়িতে একবার আরশোলা দেখা গেলে খুব দ্রুত সংখ্যা বেড়ে যায়।
৪. তারা খাবার ছাড়াও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে
আরশোলার শরীর অবিশ্বাস্যভাবে অভিযোজিত।
তারা—
প্রায় এক মাস খাবার ছাড়া বাঁচতে পারে
খুব অল্প পরিমাণ জল নিয়েও টিকে থাকতে পারে
দীর্ঘ সময় খাদ্যের অভাব সহ্য করতে পারে
এ কারণে দুর্যোগ বা কঠিন পরিবেশেও তারা সহজে মারা যায় না।
৫. তাদের শরীর অত্যন্ত নমনীয়
আরশোলার শরীর চ্যাপ্টা ও নমনীয়।
তারা এমন সরু ফাঁক দিয়েও ঢুকে যেতে পারে যেখানে অন্য প্রাণী প্রবেশ করতে পারে না।
মানুষের চোখে ছোট একটি ফাটল, আরশোলার কাছে সেটি বিশাল রাস্তা।
আরশোলা ও পারমাণবিক বোমা: সত্যি কি তারা বেঁচে যায়?
একটি প্রচলিত ধারণা
বিশ্বজুড়ে একটি কথা খুব জনপ্রিয়—
“পারমাণবিক যুদ্ধের পর শুধু আরশোলাই বেঁচে থাকবে।”
কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন।
যদি কোনো পারমাণবিক বোমা সরাসরি কোনো স্থানে বিস্ফোরিত হয়, তাহলে—
প্রচণ্ড তাপ
বিস্ফোরণের চাপ
আগুন
শকওয়েভ
এসবের কারণে আরশোলাও মারা যেতে পারে।
তাহলে মানুষ এমন ধারণা কেন করে?
কারণ তারা বিকিরণ কিছুটা বেশি সহ্য করতে পারে
আরশোলার শরীরের কোষ মানুষের তুলনায় ধীরে বিভাজিত হয়।
ফলে কিছু ক্ষেত্রে তারা মানুষের তুলনায় বেশি পরিমাণ বিকিরণ সহ্য করতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে তারা অমর।
বরং তারা শুধু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে বেশি সহনশীল।
বাস্তব উদাহরণ: হিরোশিমা ও নাগাসাকি
১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল।
বিস্ফোরণের পরে আশেপাশের অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় দেখা যায়।
এই ঘটনাই অনেকের মনে ধারণা তৈরি করে—
“আরশোলা পারমাণবিক বোমা থেকেও বেঁচে যায়।”
কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলেন, এর মানে এই নয় যে বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থলে থাকা সব আরশোলা বেঁচে ছিল।
অনেক পোকা নিরাপদ দূরত্বে ছিল অথবা পরে আবার বংশবিস্তার করেছে।
ডাইনোসর হারিয়ে গেল, কিন্তু আরশোলা রয়ে গেল
প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে একটি বিশাল গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত করে।
এর ফলে পৃথিবীর প্রায় ৭৫% প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ডাইনোসরও হারিয়ে যায়।
কিন্তু আরশোলা বেঁচে যায়।
কেন?
কারণ:
ছোট শরীর
কম খাবার লাগে।
লুকানোর ক্ষমতা
মাটির নিচে বা ছোট গর্তে আশ্রয় নিতে পারে।
সব ধরনের খাবার খাওয়ার ক্ষমতা
খাবার পরিবর্তন হলেও তারা মানিয়ে নিতে পারে।
যদি পৃথিবী থেকে আরশোলা হঠাৎ হারিয়ে যায়?
অনেকেই হয়তো ভাবছেন—
“এটা তো দারুণ খবর হবে!”
কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্ন কথা।
আরশোলা—
মৃত জৈব পদার্থ ভেঙে দেয়
মাটির পুষ্টি চক্রে সাহায্য করে
অনেক প্রাণীর খাদ্য হিসেবে কাজ করে
তাই তারা হঠাৎ বিলুপ্ত হয়ে গেলে বাস্তুতন্ত্রে বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে।
আরশোলা অমর নয়, তারা অভিযোজনের রাজা
আরশোলা কোনো জাদুকর প্রাণী নয়।
তারা অমরও নয়।
কিন্তু কোটি কোটি বছরের বিবর্তন তাদের এমনভাবে তৈরি করেছে যে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে সফল বেঁচে থাকা প্রাণীগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
সভ্যতা এসেছে, সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে, পৃথিবী অসংখ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে—
তবুও আরশোলা রয়ে গেছে।
কারণ পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াইয়ে সবসময় সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী জেতে না।
জিতে সেই প্রাণী, যে পরিবর্তনের সাথে সবচেয়ে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে।

Post a Comment