মহাকাশে গেলে মানুষের শরীরে কী পরিবর্তন হয়? অবাক করা তথ্য
মহাকাশ মানুষের কাছে সবসময়ই রহস্যময় এবং আকর্ষণীয় একটি জায়গা। ছোটবেলা থেকে আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি, মহাকাশে গেলে কেমন লাগবে। সিনেমায় আমরা দেখি মানুষ ভেসে বেড়াচ্ছে, অদ্ভুত পোশাক পরে কাজ করছে, আর জানালার বাইরে ভেসে উঠছে নীল পৃথিবী। কিন্তু বাস্তবে মহাকাশে যাওয়া শুধু রোমাঞ্চকর নয়, এটি মানুষের শরীরের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
পৃথিবীতে আমরা মাধ্যাকর্ষণের মধ্যে বসবাস করি। আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এই মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে মানিয়ে কাজ করে। কিন্তু যখন কোনো মহাকাশচারী পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে প্রবেশ করেন, তখন সেই পরিচিত পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেখানে ওজনহীনতা তৈরি হয়, যাকে বলা হয় মাইক্রোগ্রাভিটি। এই পরিবেশে মানুষের শরীরে একের পর এক পরিবর্তন শুরু হয়।
মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো যেমন নাসা, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি এবং অন্যান্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশচারীদের শরীর নিয়ে গবেষণা করছে। কারণ ভবিষ্যতে মানুষ চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহে দীর্ঘ সময় থাকতে চাইলে এসব পরিবর্তন সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মহাকাশে গেলে মানুষের শরীরে যে পরিবর্তনগুলো ঘটে তার মধ্যে কিছু এতটাই অবাক করার মতো যে শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন। কেউ কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে যান, কারও মুখ ফুলে যায়, কারও আবার দৃষ্টিশক্তি পরিবর্তন হয়ে যায়। এমনকি মহাকাশে গেলে মানুষের ঘুমের ধরণ এবং খাবারের স্বাদ পর্যন্ত বদলে যায়।
এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো মহাকাশে গেলে মানুষের শরীরে কী পরিবর্তন হয় এবং কেন এসব পরিবর্তন ঘটে।
মহাকাশে গেলে শরীর ওজনহীন হয়ে যায়
মহাকাশে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো শরীরের ওজনহীনতা। পৃথিবীতে আমরা সবসময় মাধ্যাকর্ষণের কারণে মাটিতে থাকি। কিন্তু মহাকাশে গেলে শরীর ভেসে থাকে।
এই অবস্থায় প্রথমদিকে মহাকাশচারীরা অস্বস্তি অনুভব করেন। হাঁটার পরিবর্তে ভেসে চলতে হয়। বসার জন্য কোনো চেয়ার দরকার হয় না। এমনকি jol পান করার সময়ও সাবধান থাকতে হয়, কারণ jol ফোঁটা আকারে ভেসে বেড়ায়।
এই ওজনহীনতা মানুষের শরীরের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। শরীরের ভারসাম্য, রক্ত সঞ্চালন এবং পেশির ওপর এর প্রভাব পড়ে।
মস্তিষ্ক ও শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়
মহাকাশে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকদিন মহাকাশচারীদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় ভারসাম্য নিয়ে। পৃথিবীতে আমাদের শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে inner ear। এই অংশটি মাধ্যাকর্ষণের সাহায্যে কাজ করে।
কিন্তু মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় এই সিস্টেম বিভ্রান্ত হয়ে যায়। ফলে মহাকাশচারীরা মাথা ঘোরা, বমি ভাব এবং শরীরের ভারসাম্য হারানোর মতো সমস্যার মুখোমুখি হন।
অনেক মহাকাশচারী জানান, মহাকাশে প্রথম কয়েকদিন চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে যায়। কেউ কেউ দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে বসেন। তবে কয়েকদিন পর শরীর নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
মহাকাশে গেলে মানুষ লম্বা হয়ে যায়
মহাকাশে গেলে মানুষের উচ্চতা কিছুটা বেড়ে যায়। পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণের কারণে আমাদের মেরুদণ্ড কিছুটা চাপে থাকে। কিন্তু মহাকাশে গেলে এই চাপ কমে যায় এবং মেরুদণ্ড প্রসারিত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে মহাকাশে গেলে মানুষের উচ্চতা ২ থেকে ৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। অনেক মহাকাশচারী এই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।
তবে পৃথিবীতে ফিরে আসার কয়েকদিনের মধ্যেই উচ্চতা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
মুখ ফুলে যায় এবং পা চিকন হয়ে যায়
মহাকাশে গেলে শরীরের রক্ত সঞ্চালনে বড় পরিবর্তন ঘটে। পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণের কারণে শরীরের নিচের দিকে বেশি রক্ত জমা থাকে। কিন্তু মহাকাশে রক্ত শরীরের উপরের দিকে চলে যায়।
এর ফলে মুখ ফুলে যায় এবং পা চিকন হয়ে যায়। অনেক সময় মহাকাশচারীরা বলেন, মহাকাশে গেলে নাক বন্ধ লাগার মতো অনুভূতি হয়।
পেশি দুর্বল হয়ে যায়
মহাকাশে গেলে পেশির ব্যবহার কমে যায়। পৃথিবীতে হাঁটা, দাঁড়ানো এবং চলাফেরার সময় পেশি কাজ করে। কিন্তু মহাকাশে ভেসে থাকার কারণে পেশির কাজ কমে যায়।
ফলে পেশি দুর্বল হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকলে পেশির শক্তি আরও কমে যায়।
এই কারণে মহাকাশচারীদের প্রতিদিন ব্যায়াম করতে হয়।
হাড় দুর্বল হয়ে যায়
মহাকাশে গেলে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় হাড়ের ওপর চাপ কমে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি মাসে হাড়ের ঘনত্ব প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
চোখের সমস্যা দেখা দেয়
মহাকাশে গেলে চোখের ওপর চাপ বাড়ে। শরীরের তরল মাথার দিকে চলে আসায় চোখের সমস্যা দেখা দেয়।
এর ফলে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
হৃদযন্ত্রের পরিবর্তন
মহাকাশে গেলে হৃদযন্ত্রের কাজ কমে যায়। ফলে হৃদযন্ত্র কিছুটা ছোট হয়ে যেতে পারে।
DNA তেও পরিবর্তন হতে পারে
মহাকাশে বিকিরণের মাত্রা বেশি থাকে। এর ফলে DNA তে পরিবর্তন হতে পারে।
ঘুমের সমস্যা হয়
মহাকাশে প্রতিদিন ১৬ বার সূর্যোদয় দেখা যায়। ফলে ঘুমের সমস্যা হয়।
মহাকাশে বিশেষ ব্যাগে ঘুমাতে হয়।
খাবারের স্বাদ বদলে যায়
মহাকাশে গেলে খাবারের স্বাদ কম লাগে। অনেক মহাকাশচারী ঝাল খাবার পছন্দ করেন।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়
মহাকাশে গেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখলে মানসিক পরিবর্তন
মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখলে অনেক মহাকাশচারীর মানসিক পরিবর্তন হয়। পৃথিবীকে ছোট এবং ভঙ্গুর মনে হয়।
মহাকাশ থেকে ফিরে এলে কী হয়
পৃথিবীতে ফিরে এলে শরীর আবার মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। হাঁটতে সমস্যা হয়।
মহাকাশে গেলে মানুষের শরীরে অনেক পরিবর্তন ঘটে। ভবিষ্যতে মানুষ যখন অন্য গ্রহে যাবে তখন এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
FAQ:
মহাকাশে গেলে মানুষের শরীরে কী পরিবর্তন হয়
১. মহাকাশে গেলে মানুষ কি সত্যিই লম্বা হয়ে যায়?
হ্যাঁ, মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় মেরুদণ্ড প্রসারিত হয়। ফলে মানুষ সাধারণত ২ থেকে ৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে যেতে পারে। তবে পৃথিবীতে ফিরে আসার পর আবার আগের উচ্চতায় ফিরে আসে।
২. মহাকাশে গেলে মুখ ফুলে যায় কেন?
মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় শরীরের রক্ত ও তরল উপরের দিকে চলে আসে। এর ফলে মুখ ফুলে যায় এবং নাক বন্ধ লাগার মতো অনুভূতি হয়।
৩. মহাকাশে গেলে পেশি দুর্বল হয়ে যায় কেন?
মহাকাশে ভেসে থাকার কারণে পেশির ব্যবহার কম হয়। ফলে ধীরে ধীরে পেশি দুর্বল হয়ে যায়। তাই মহাকাশচারীদের প্রতিদিন ব্যায়াম করতে হয়।
৪. মহাকাশে মানুষ কীভাবে jol পান করে?
মহাকাশে jol ভেসে বেড়ায়, তাই বিশেষ প্যাকেট বা স্ট্র ব্যবহার করে jol পান করতে হয়।
৫. মহাকাশে মানুষ কীভাবে ঘুমায়?
মহাকাশচারীরা বিশেষ স্লিপিং ব্যাগ ব্যবহার করেন। তারা দেয়াল বা ছাদের সঙ্গে নিজেদের বেঁধে ঘুমান যাতে ভেসে না যান।
৬. মহাকাশে গেলে কি হাড় দুর্বল হয়ে যায়?
হ্যাঁ, মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় হাড়ের ওপর চাপ কমে যায়। ফলে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায় এবং দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকলে হাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
৭. মহাকাশে গেলে চোখের সমস্যা হয় কেন?
শরীরের তরল মাথার দিকে চলে আসায় চোখের ওপর চাপ পড়ে। এর ফলে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
৮. মহাকাশে গেলে মানুষ অসুস্থ হয় কি?
মহাকাশে প্রথম কয়েকদিন অনেক মহাকাশচারীর মাথা ঘোরা ও বমি ভাব হয়। এটাকে স্পেস মোশন সিকনেস বলা হয়।
৯. মহাকাশে খাবারের স্বাদ কেন বদলে যায়?
মুখ ফুলে যাওয়া এবং নাক বন্ধ লাগার মতো অনুভূতির কারণে খাবারের স্বাদ কম লাগে। তাই মহাকাশচারীরা ঝাল খাবার বেশি পছন্দ করেন।
১০. মহাকাশ থেকে ফিরে এলে কী হয়?
পৃথিবীতে ফিরে আসার পর শরীর আবার মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। হাঁটতে সমস্যা হয়, মাথা ঘোরে এবং শরীর দুর্বল লাগে।
আরো পড়ুন :
বরফের ভেতর লুকানো রক্তের জলপ্রপাত! অ্যান্টার্কটিকার ব্লাড ফলসের ভয়ংকর রহস্য


Post a Comment